বাঁশখালী নিউজ ডেস্কঃ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নে সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল বুধবার বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী পক্ষের লোকজন। এ সমাবেশ থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, আগামীকাল শুক্রবারের মধ্যে গণ্ডামারার কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সমাবেশে ৬০০ থেকে ৭০০ লোক অংশ নেন। তাঁদের অনেকেই বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষের লোকজন ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা এবং খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে বাঁশখালীতে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় ছাত্র ঐক্য ফোরাম। অবশ্য উপজেলা সদরে হরতাল পালিত হয়নি। যানবাহন চলেছে, খোলা ছিল দোকানপাটও। তবে গণ্ডামারা এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলে বাধা দেন স্থানীয় কিছু যুবক।

গতকাল বিকেলে বাঁশখালী থানা কার্যালয়ে অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) মো. হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাঁশখালীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। হরতাল পালিত হয়নি। গণ্ডামারা এলাকায় কম চললেও গাড়ি চলাচল করেছে।

আসামি আবদুল খালেকের হাতে হাতকড়া। তাঁর চিকিৎসা চলছে চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাঁশখালীতে গত সোমবারের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হন তিনি। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটায় হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ড থেকে তোলা ছবি।

এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গণ্ডামারা ইউনিয়নে ২৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হচ্ছে। গত সোমবার গণ্ডামারার হাদিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে-বিপক্ষের লোকজন সমাবেশ ডাকেন। এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই ভাইসহ চারজন নিহত হন। এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী বসতভিটা ও গোরস্তান রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক লিয়াকত আলীসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় তিন সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে পশ্চিম গণ্ডামারা গ্রামের মনাজি পুকুরপাড় এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী পক্ষের লোকজন। সমাবেশে বসতভিটা ও গোরস্তান রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক লিয়াকত আলীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন স্থানীয় বাসিন্দা আলী নবী, নূর মোহাম্মদ, আমিন উল্লাহ, আবু আহমেদ, মো. খালেদ, মো. মোস্তফা প্রমুখ।

সমাবেশে লিয়াকত আলী বলেন, আগামী শুক্রবারের মধ্যে সরকার কিংবা প্রশাসনকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাতিল করতে হবে। নইলে থানা, উপজেলা প্রশাসন ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, পুলিশের গুলিতেই চারজনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দিতে আর আন্দোলন বন্ধ করতে তাঁকে মামলার আসামি করেছে। সমাবেশে উপস্থিত থাকা স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, এলাকায় প্রকল্পটি স্থাপিত হলে তাঁদের ক্ষতি হবে। এ জন্য তাঁরা এটি বাতিল চান। তাঁরা বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি হারাতে চান না।

সমাবেশে যোগ দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, তাঁদের জমি বা বাড়ি এই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়নি। তাহলে তাঁদের কী ক্ষতি হবে তা জানতে চাইলে বলেন, পরিবেশের ক্ষতি হবে। তাঁদের অনেকের অভিযোগ, প্রথমে বলা হয়েছিল কারখানা করা হবে। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ প্রকল্প হচ্ছে। তাই এর বিরোধিতা করছেন তাঁরা।

গ্রামবাসীদের অভিযোগের বিষয়ে এসএস পাওয়ার প্লান্টের প্রজেক্ট সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিন গতকাল বিকেলে উপজেলার শিলকূপ এলাকায় প্রকল্প কার্যালয়ে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, দুই বছর ধরে এই প্রকল্পের জন্য ৬২৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির ন্যায্যমূল্যও দেওয়া হয়েছে। তখন এলাকার কেউ এর বিরোধিতা করেনি। তাঁর দাবি, হঠাৎ করে গ্রামের সহজ-সরল লোকজনকে ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছে। এ জন্য তিনি বসতভিটা ও গোরস্তান রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক লিয়াকত আলীকে দায়ী করেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে লিয়াকত বলেন, আন্দোলনে তাঁর কোনো স্বার্থ নেই। এলাকার লোকজনের সঙ্গে তিনিও আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।

এদিকে গতকালের হরতালে বাঁশখালী সদর এলাকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল। স্থানীয় অনেকে বলেছেন, হরতাল ডাকার বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। বাসচালক দুদু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট থেকে যাত্রী নিয়ে দুপুরে বাঁশখালী এসেছি। কোনো বাধা পাইনি। হরতালের কথা জানি না।’ একই কথা বলেছেন অটোরিকশাচালক মোরশেদ আলম। উপজেলা সদরের মুদি দোকানদার পরীক্ষিত দেব জানান, হরতালের পক্ষে রাস্তায় কেউ ছিল না।

চট্টগ্রাম-বাঁশখালী সড়কে যানবাহন চললেও সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে টাইমবাজার-গণ্ডামারা সড়কে গতকাল সকাল থেকে অটোরিকশা চলাচলে বাধা দেওয়া হয়। গতকাল বেলা তিনটায় গণ্ডামারা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীবাহী একটি অটোরিকশাকে চলতে বাধা দেন কয়েকজন যুবক। এই সড়কে শুধু অটোরিকশা চলে। বাধাদানকারী দুই যুবক আমিনুল হক ও মো. সেলিম বলেন, বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে হরতাল পালন করছেন তাঁরা। খুনিদের বিচারের দাবিতেই তাঁরা এ কাজ করছেন।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন শেষে ছাত্র ঐক্য ফোরামের নেতা শাহনেওয়াজ চৌধুরী হরতালের ডাক দেন। কর্মসূচির বিষয়ে জানতে গতকাল মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর ফোন বন্ধ পাওয় যায়।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চারজনকে গত মঙ্গলবার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা হলেন আবদুল খালেক (২৯), মজিবুর রহমান (১৮), আনসার উল্লাহ (৩৫) ও জহিরুল ইসলাম (৩০)। ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডের কর্তব্যরত কনস্টেবল ইসমাইল বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাঁরা গ্রেপ্তার হওয়া রোগীদের পাহারা দিচ্ছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আসামিকে হাতকড়া পরানো যায় কি না, তা জানতে চাইলে একজন জেল সুপার নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো আসামিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতকড়া লাগানো বা ডাণ্ডাবেড়ি পরানো যায়। তবে সবকিছু পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। অস্ত্রোপচারের আসামি বা মুমূর্ষু বন্দীকে মানবিক কারণে হাতকড়া পরানো হয় না।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বপন কুমার মজুমদার বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মেডিকেলে চিকিৎসাধীন চারজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠছেন। শিগগির তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।