বাঁশখালীর সোনার ছেলে ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম

অধ্যাপক আবদুল করিম মধ্যযুগে বাংলার ইতিহাসের প্রবাদপ্রতিম ইতিহাসবিদ।

ডক্টর আবদুল করিম। বাংলাদেশ শুধু নয় উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার চাপাছড়ি গ্রামে। বাঁশখালী বাসীকে ধন্য করে গেছেন এই ইতিহাসবেত্তা। লিখেছেন ‘বাঁশখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থটি।

তিনি জন্ম গ্রহণ করেন জন্ম ১ জুন, ১৯২৮ সালে। মৃত্যুবরণ করেন ২৪ জুলাই, ২০০৭ সালে।

ড.আব্দুল করিম ১৯৪৪ সালে চট্টগ্রাম আই আই কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ২য় স্থান অধিকার করে প্রবেশিকা পাস করেন। ১৯৪৬ সালে ঐ প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রথম বিভাগে ৮ম স্থান অধিকার করে আই.এ পাস করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৪৯ সালে ২য় শ্রেণীতে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৫০ সালে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ড. আব্দুল করিম ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি রীডার পদে উন্নীত হন। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে রীডার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৯২ সালের জুন থেকে ১৯৯৬ সালের জুন পর্যন্ত তিনি সুপারনিউমারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন

আব্দুল করিম ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সহকারী হাউস টিউটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি ঐ হলের হাউস টিউটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডীন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।


“একুশে পদক” প্রাপ্ত বাঁশখালীর এই বীর সন্তানের প্রতি ‘বাঁশখালী নিউজ’ পরিবারের পক্ষ থেকে জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী।


বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, উপাচার্যসহ বিভিন্ন পদে থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেও তাঁর ইতিহাস চর্চা ও গবেষণা কাজ অব্যাহত রাখেন।

বাংলার ইতিহাসের অনেক জটিল ও অমীমাংসিত বিষয় আবদুল করিম কঠোর শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠার সাথে সমাধান করে দিয়েছেন। ইতিহাস বিষয়ে তাঁর কর্মকাণ্ড ও অবদান খুবই সুবিন্যস্ত এবং কাজের পরিধির বিশালত্ব ও বৈচিত্র্য যে কোনো নিবিষ্ট পাঠক-গবেষককে মোহাচ্ছন্ন করে। সাধারণভাবে তাঁর রচনাবলি ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহকে পাঁচ ভাগে দেখানো যেতে পারে।
১. বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
২. ধর্ম ও সাহিত্য
৩. জীবন ও কর্ম
৪. স্থানীয় ইতিহাস
৫. স্মৃতিকথা

উল্লেখযোগ্য বই- Murshid Quli khan and his times (1963), Dhaka the Mughal Capital (1964), corpus of Muslim coins of Bengal Down in 1538, Catalogue of Coins in the Calienet of Chittagong University Museum (1979), Corpus of the Arabic and persian inscriptions of bengla (1992), History of Bengal Mughal period vol. 1 (1576-1627) and vol. 2 (1627-1707), The Rohinga Muslims : Their History and culture, বাংলার সুফী সমাজ, মক্কা শরীফে বাঙালি মাদ্রাসা,
ফুতুহাত-ই-ফিরোজশাহী, বাংলার ইতিহাস (মোগল আমল), বাংলার ইতিহাস: সুলতানী আমল (১৯৭৮), ঢাকাই মসলিন (১৯৬৫), ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন (১৯৬৯), (১৯৬৯), মুসলিম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য (১৯৯৪), বাংলা সাহিত্যের কালক্রম, মধ্যযুগ (১৯৯৪), ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস: মুসলিম আমল (১৯৯৮), বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭) প্রভৃতি। এছাড়াও চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক বহু
সংখ্যক গবেষণামূলক প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন যা বিভিন্ন দৈনিক জার্নাল ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের
শেষ দিকে তিনি রচনা করেন আত্মজীবনী। ‘সময় ও জীবন’ নামে এই গ্রন্থ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৯৯ সালে বাণিগ্রাম সাধনপুর স্কুলের অনুষ্টানে ড. আব্দুল করিম ।

আবদুল করিম ছিলেন নিষ্ঠাবান ধর্মপরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ ও মানবতাবাদী সাধক। চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারে ওলী-দরবেশদের ভূমিকা নিয়ে তিনি দীর্ঘকাল গবেষণা করেছেন। রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ। চট্টগ্রামের তথা বাংলাদেশের ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে এগুলো মূল্যবান আকর গ্রন্থ বিশেষ।

অধ্যাপক আবদুল করিম অধ্যাপনা ও গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ (তৎকালীন পাকিস্তান) এর জেনারেল সেক্রেটারি (১৯৬৪-১৯৬৬) ছিলেন। সংস্থাটি ১৯৯৫ সালে তাঁকে ফেলোশিপ ও ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক প্রদান করে। তিনি বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৭৩-৭৭ সালে, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সংস্থাটি তাঁকে সংবর্ধনা ও স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। তিনি দেশে-বিদেশে অনেক সংস্থার ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৯২-৯৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার নিউমারারী প্রফেসর, ২০০১ থেকে আমৃত্যু প্রফেসর ইমেরিটাস ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়াম তাঁর প্রতিষ্ঠত ও চিন্তাপ্রসূত। যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি ও গুরুত্ব লাভ করেছে।

ইতিহাস বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ প্রণেতা, হাটহাজারী কলেজ ও পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় ডিগ্রী কলেজের অন্যতম এই প্রতিষ্ঠাতা বিগত ২৪ জুলাই ২০০৭ সালে ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
১৯৯৫ সালে “একুশে পদক” প্রাপ্ত বাঁশখালীর এই বীর সন্তানের প্রতি ‘বাঁশখালী নিউজ’ পরিবারের পক্ষ থেকে জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী। আল্লাহ মরহুম কে জান্নাত দান করুন।